রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
৬ই আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিক্ষতবেদনায় লিখিত অন্তর্দহন বা এক বিপ্লবীর আত্মসন্ন্যাস গমনকাল

রিগ্যান এসকান্দার

🕒 প্রকাশ: ১২:৩৬ অপরাহ্ন, ৩০শে আগস্ট ২০২৬

#

১. দাহকালপর্ব অথবা স্বপ্নভঙ্গের বেদনাদংশন
' আমার মৃত্যুর জন্য তোমরা রাষ্ট্রের ফাঁসি দাবি করো।'
কবি এহসান হাবীবের কবিতাগ্রন্থ ' পুষ্পদাহকাল' ভয়াবহ বাস্তব দ্বারা আক্রান্ত। এ যেন গ্লানি ও নৈরাশ্যের যাপিত ভ্রমণে ক্লান্ত এক গুটিয়ে যাওয়া বীরের স্বপ্নভঙ্গের বেদনাদংশন। কবির জীবনবোধের গভীরতা তল্লাশি করতে যেয়ে মাধুর্যের কোমলতা পাওয়া যায়নি গ্রন্থের প্রথম বাইশটি কবিতায়। কড়া বাস্তবতার রোদে চৌঁচির হয়েছে হৃদয়প্রান্তর। বিক্ষতবেদনায় লিখিত হয়েছে কবির অন্তর্দহন। যেন কবিই এক পুষ্প, যার নিচে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এক দাহচুল্লি। কে জ্বালিয়ে দিলো? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের ভ্রমণ করতে হয় গ্রন্থের প্রথম বাইশটি কবিতায়। কবি এ কবিতাগুলোয় মূলত চিহ্নিত করে গেছেন রাষ্ট্রের গোপন অনৈতিক ব্যাভিচার। এই ব্যাভিচার কবি মানতে পারেননি। এই ছলনা কবিকে দগ্ধ করেছে। তবে প্রতিবাদ করেছেন কি? না। কবি সমাজ- রাষ্ট্রের সিস্টেমের ওপর ককটেল ছোঁড়েননি। বিচারও করতে চাননি। বরং কবিতাগুলো পড়লে মনে হয় সমস্ত কবিতাজুড়ে সমাজ- রাষ্ট্র-সিস্টেমের দোষ চিহ্নিত করে একটি সুইসাইড নোট লিখে রেখে মহাকালের হাতে বিচারের দায়িত্ব তুলে দিতে চাইছেন। এই যে সুইসাইড, এও কি এক প্রতিবাদ? তাহলে কবি কি আমাদের এক মনস্তাত্ত্বিক অন্তদ্বন্দ্বের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে শালুক ও শালগমের কাছে যেয়ে জীবনানন্দের মতো নিথর নিভৃত হয়ে যাওয়াতেই মুক্তির উপায় অনুসন্ধান করেছেন। মূলত তাই-ই। এ গ্রন্থের শালুক ও শালগম পর্বে আমরা সেসব দৃশ্যের সতীত্বে মুগ্ধ হয়ে উঠব। আপতত ফিরি প্রথম বাইশ কবিতার মর্মজ্ঞানে।
পুঁজিব্যবস্থা একজন মানুষকে সিস্টেমের জাঁতাকলে ফেলে উন্মুক্ত সঙ্গম শেষে কীভাবে বিছানাতেই ছেড়ে যাচ্ছে, তারই সেই নোংরা চিত্ররূপ এহসান হাবীব তুলেছেন কলমে—
' আগুন
রক্ত
হোলির ভেতর
কিছু মানুষ গোপন শলা করছে।
মানুষের ক্রোধের মধ্যে
ক্রোধের রক্ত শিরায় কারা খেলা করে?'
আবার বলছেন —
' আগুনের ভেতর নগ্ন মহাসড়কে চুমু খেতে খেতে
আমরা
রবীন্দ্রসংগীত শুনছি। '
আমাদের এইসব চুমু, এইসব রবীন্দ্রসংগীত-শ্রবণ কী পুঁজিবাস্তবের ছাপচিত্র নয়? প্রশ্ন থেকে যায়।
'তারা দূরে বসে কাঁদে ' কবিতায় কবি লিখেছেন —
' অদ্ভুত ক্যামোফ্লেজে ঝুলে থাকা মানুষেরা কী করে?
যেন একটি বাদুড়, শুধু ক্ষিপ্রতায় শূন্যে ঝুলে থাকে।
তাদের কেউ কেউ মাঝরাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে
শুধু খুন হয়ে যায়। কারো কারো মাথার ভেতর, খুলির ভেতর গুলি চলে
তারপর অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে।'
এই নীরবতার করুণ সাক্ষী হয়ে কবি যেন দাঁড়িয়ে আছেন এক রক্তাক্ত জমিনের ওপর, চারিদিকে ব্যর্থ, মৃত্যু আর অসহায়ত্বের ভাগাড়, আর কবি যেন এক যুদ্ধ ফেরত পরাজীত বীর। ম্যাকবেথের মতো নিজেকে এখন তুলে দিতে হবে ভাগ্যের হাতে। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা যেখানে মানুষের এই ভাগ্যের নিয়ন্ত্রক। কবির হাতে আর কোনো অপশন নেই। মূলত সিনপাঠ চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে তাঁর অজান্তেই —
দূরত্ব কবিতায় বলেছেনও সে কথা —
' ছায়ার নিকট থেকে ছায়া সরে যাচ্ছে
হাতের ওপর থেকে হাত
নদীর ওপর থেকে চাঁদ সরে যাচ্ছে '
শেষে বলছেন —
' কাঁপতে কাঁপতে
সরে যাচ্ছে দূরে।
তাদের নিজেদের অজান্তে! '
এসব যেন কবির স্বপ্নভঙ্গের গান। এ রকম স্বপ্ন ভঙ্গের বহু চিত্র এ গ্রন্থে পাওয়া যাচ্ছে, যা কবির গভীর অস্তিত্ব সংকটকে বিশদভাবে উসকে দিচ্ছে।
যেমন, ' শিরোনামের মুখ বন্দি ' কবিতার দুটি চরণ খেয়াল করি —
১. ' শাঁই করে পত্রশূন্য হয়ে যাচ্ছে বৃক্ষরা '
২. ' নদীতীরে ঘুমিয়ে পড়ছে পৃথিবীর শিশুরা '
এই সব দৃশ্যচিত্রের আড়ালে কী ঘটছে? গণমানুষের মিছিল জড় হচ্ছে? মুষ্টিবদ্ধ হাত উদ্বেলিত হচ্ছে? না। এসব কিছুই হচ্ছে না। যদিও কবি খুব করে চেয়েছেন এসব ঘটুক। সাহস করে ভেবেছেনও —
' তুমুল জনারণ্যে
মানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাতের ভিড়ে
একবার আমাদের দেখা হোক। '
এ কথা উঠে এসেছে তাঁর আজীবন লালিত গোপন বিপ্লবের স্বপ্ন থেকে। কিন্তু কবির প্রাজ্ঞতা আজ যেন সেই স্বপ্নের সাথে দ্বান্দ্বিকতার খেলায় ভীষণভাবে উত্তীর্ণ। তাঁর বিশ্বাস আজ ভীন্নতর। কবি বলছেন —
'এই সব দৃশ্যের আড়ালে মানুষেরা মরে যাচ্ছে বোবা আর্তনাদে। '
কবি যেন চিত্তের দার্শনিকতায় চিরন্তন সেই সত্যকে বুঝে ফেলেছেন। আস্থা ক্ষিণ হয়ে আসছে। তাঁর বহুদিনের স্বপ্নের বিপ্লবের নিশ্চয়তার দিকে নিজেই যেন তুলছেন এক প্রশ্নবোধক বাক্য—
' কিন্তু একশ বছরের অনন্ত মৃত্যুর ঘুম ভেঙে
তুমি আসবে তো? বিপ্লব?
কেন এই এই আস্থাহীনতা? কেন এই অবিশ্বাস? সেই উত্তরও আছে এই পুষ্পদাহকালে —
' গ্যারেজমালিক থেকে শুরু করে
বন্দুকের নল পরিষ্কারকারী শ্রমিকটি পর্যন্ত
সহজেই আলাদা করে ফেলতে পারছে শত্রু-মিত্র।
শুধু আমাদের চোখে দৃষ্টিশক্তি ছিল না
আমাদের মুখে ভাষা ছিল না
আমাদের শ্রবণশক্তি ছিল না।
আমাদের হাত ভারপ্রাপ্ত ছিল।
আমরা শুধু ভারপ্রাপ্ত ছিলাম।
আমরা তো ভারপ্রাপ্ত হতে হতে ক্রমশ ভারবাহী হয়ে উঠছি। '
তাই কবি আর বিশ্বাস পাচ্ছেন না। এই নগর রাষ্ট্রের ব্যভিচারী-ভিড় এড়িয়ে চলে গেলেন শালগমের কাছে। তাঁর আঁচলের নিচে নিজেকে একটু এলিয়ে দিয়ে শান্ত হতে চাইছেন এবার, সমস্ত ক্লান্তি ভুলে জীবনের স্নিগ্ধতা পান করতে চাইছেন একান্তভাবে।
আহ্, জীবনের প্রতি কী এক সমূহ ঘৃণায় একজন বিপ্লবী কবি সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে জীবনানন্দের সেই ধূসর রেল লাইন ধরে হেঁটে চলে যাচ্ছেন, দারুণ নিভৃতে। হেঁটে হেঁটে কোথায় পৌঁছাতে চান কবি? উত্তর হলো — শালুক ও শালগমের কাছে। চলে যাচ্ছেন। চলে যেতে যেতে তাঁর অন্তিম সুইসাইড নোটে কতটা ঘৃণায় বলে গেলেন —
' আমাকে বলতে দাও রাষ্ট্র
এই তো শেষবার
ফ্যাসিবাদের এই বুড়ি সুন্দরীকালে
তোমাদের ছেনালিপনার ইতিবৃত্ত আমাকে বলে যেতে দাও। '
২.দাহমুক্তিপর্ব অথবা কবির আত্মতুষ্টির খেয়াল :
পুষ্পদাহকালে এতক্ষণ আমরা কবির যে আত্মদহনের রূপচিহ্ন পেলাম, শালুক ও শালগম পর্ব হলো সেই দহনকে কমিয়ে স্নিগ্ধ-প্রশান্তিরূপ দান করার কবির এক মস্তিষ্কপ্রসূত খেয়াল। এ খেয়ালের ভগবান কবি নিজেই। এ কবিতাগুলো মাধুর্যের কোমলতায় ভরপুর। 'শালুক ও শালগম' শিরোনামে চৌদ্দটি কবিতা আমরা পাচ্ছি পুষ্পদাহকালের শেষপর্যায়ে। বাস্তব থেকে লুকিয়ে পড়া কবি একখান সুইসাইড নোট লিখে রেখে বাস্তব জগত থেকে সটকে পড়লেন এবার পরাবাস্তব জগতে। এখানেই খুঁজলেন মুক্তি। কবি বিপ্লবে বিশ্বাস হারিয়ে খুঁজলেন ভাববাদী প্রেমে মুক্তির উপায়। নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইলেন। আর প্রেমের কাছে করতে চাইলেন আত্মসমর্পণ। এই পরাবাস্তব ভ্রমণে কবির দুজন প্রেমিকার সাথে আমাদের পরিচয় হচ্ছে। এক প্রেমিকার নাম — শামুক, অপর প্রমিকার নাম — শালগম। কবির কব্যিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ এই অসাধারণ কবিতাগুলো। আত্ম-চৈতন মুক্তির সন্ধানে ভ্রমণরত এক কবি নিজেই সাজিয়ে নিলেন ভিন্নতর এক জগত, যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজের উৎপাত নেই, সিস্টেমের ব্যভিচার নেই, চাপিয়ে দেওয়া দাসত্ব নেই। আছে সন্ধ্যা। সন্ধ্যায় এক নদীর ছবিচিত্র আছে। সেই নদীতে আছে কবির প্রেমিকা। নাম তার শামুক। কবি বলছেন —
' ওই যে শামুক, যাকে আমি ভালোবাসি। রৌদ্রছায়ায় শামুকের সাথে আমার অনেকক্ষণ কথা হলো, শামুক আমার সঙ্গে খেলা করল। গুটিয়ে যাওয়ার আগে শামুক আমাকে অনেক আদর করল।'
কী দারুণ প্রেমরূপতার কবিতা। এই রূপদান কবির কাব্যিক সক্ষমতাকে আমাদের সামনে তুলে ধরে ভীষণ দাপট নিয়ে। সবই কবির বানানো। নিজ মেধা ও কল্পনা শক্তি ব্যবহার করে এই পর্বে যে চৌদ্দটি কবিতার অবতারণা করলেন কবি, তা সৃষ্টি করল এক ভিন্নতর জগত। জগৎ সৃষ্টি করে নেওয়ার এই সক্ষমতা কবি পেয়েছেন তার বংশসূত্রে। গ্রন্থে দুইবার তিনি এ কথার উল্লখ রেখেছেন। শালুক ও শালগম পর্বের দুই নম্বর কবিতায়—
' আমার পীরালি বংশ। মাথার ভেতর ঢুকে যাওয়ার কঠিন ব্যাধি কত সহজেই না জন্মসূত্রে পেয়ে বসে আছি। শালগম একটু বেখেয়াল হলেই তার মাথার ভেতর ঢুকে পড়ি। '
বংশের এই তথ্য কবি পুষ্পদাহকাল কবিতাগ্রন্থের প্রথম কবিতা ' রেলস্টেশন ' নামক কবিতাতেই দিয়েছিলেন —
'এটা পীরালি নয়।
যদিও আমি পীরবংশ।'
যে পীরালি গুণ কবির বাস্তবতার রূঢ়তায় কদর পায়নি, কবি নিজেও গুরুত্বপূর্ণ ভাবলেন না; সেই ভাববাদী গুণই কবির রূপকাশ্রিত জগত সৃষ্টিতে এক চমৎকার জারক হিসেবে কাজ করল।
সমৃদ্ধ চিত্ররূপকল্পে এ পর্বের কবিতাগুলো উদ্ভাসিত। নিবিড় হৃদমধুর আনন্দ-শিহরণে চিত্রায়িত।
' তারপর আমি অন্ধকারের ভেতর ক্রমশ মিলিয়ে যেতে থাকি। শামুক ও শালগম ভাবতে ভাবতে বিরল অপচয়ে আমি সন্ধ্যা খরচ করে ফেলি। '
হ্যাঁ, এভাবেই কবি তাঁর দুই প্রেমিকা শামুক ও শালগমকে ভেবেছেন চৌদ্দটি কবিতায়। কিন্তু আমি অত্যন্ত আশ্চর্য হয়েছি, কবিতার শিরোনামে প্রেমিকা শালগম আছে, শামুক নাই। প্রেমিকা শামুকের স্থলে জায়গা পেয়েছে শালুক । কবিতার শিরোনাম 'শালুক ও শালগম'। অথচ চৌদ্দটি কবিতায় শালুক শব্দটির কোনোরূপ উল্লেখ বা অস্তিত্ব বা চাপচিহ্ন বা ইশারাসংকেত পাওয়া যায়নি। এর ভিন্নতর ব্যাখ্যা কবির কাছে যদিও থেকে থাকে, তবুও শামুক ও শালুকের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যগত মিল না থাকায় শামুককে শালুক দ্বারা বোঝা বা প্রতিষ্ঠাপন করা পাঠকের জন্য বেশ কষ্টকর হয়ে যায়। যাই হোক, কবিতার এসব বৈশ্বিক বিষয় এড়িয়ে আমরা বরং ঢুকে যেতে পারি কবিতার স্নিগ্ধ অন্দরমহলে। কবি এহসান হাবীবের কবিতায় সেই স্নিগ্ধতা আমরা ভীষণভাবে পাচ্ছি।
জগত অস্বীকার করে কবি ভবঘুরে হচ্ছেন। প্রেমিকা শালগমের চোখের ভেতর ভবঘুরের মতো ঘুরছেন। শালগমের চোখের ভেতর খুঁজে পাচ্ছেন বিষণ্ণ সন্ধ্যা। অভিমান, অনুযোগের ঝাঁপি খুলে কবি যেন মেলে ধরেছেন শালগম আর শামুকের কাছে। যদিও পীরালি বংশের ছেলে জানে এসব মূলত এক ঘোর। বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এক ভ্রম তৈরি। এই মায়া, প্রেম, ছলনা, স্পর্শ, কামুকতা, পবিত্রতা সবই রহস্য। রহস্যের রাজ্যে এখন কবি বসতি গেড়েছেন, সুনীল প্রান্তরে প্রকৃতির বিস্তীর্ণ চরে এঁকেবেঁকে যাওয়া পথে হুডখোলা রিকশায় কবি আর শালগম যেন হারিয়ে যেতে চাইছেন।
এসবই কবির বানানো গল্প। পাঁচ নম্বরে বলছেনও তাই —
' এইসব বানানো গল্প, জানি তো। আর বানানো গল্পের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে : ওহ্ হো শামুক! তেপান্তরের সবুজ অন্তহীন শূন্যতা কখন যে সত্যি হয়ে ওঠে।'
শূন্যতাতেই মুক্তি। এ যেন ঋষিজ্ঞান। কবি এখন এই ঋষিজ্ঞানেই সাধন করছেন। বিপ্লবীর প্রজ্ঞা আর ঋষির জ্ঞান দুটি ভিন্নতর পথ। কবির মুক্তির জন্য বেছে নিলেন দ্বিতীয়টিকে। আমার কাছে মনে হয়েছে বিপ্লব থেকে বের হয়ে এসে কবি যে মুক্তি খুঁজেছেন, এখানে যে শুধুই কবির মুক্তি মিলেছে তাই নয়, মুক্তি মিলেছে তাঁর কবিত্বেরও। সামাজিক দায়বদ্ধতাকে একটু অস্বীকার রাখা গেলে হয়তো কবিত্ব শক্তির শিল্পের স্তরে উত্তীর্ণ সহজতর হয়ে সতেজতা লাভ করে। এমনটিই দেখেছি জীবনানন্দ দাশের ' কবিতার কথা ' রচনাটিতে। রবীন্দ্রনাথ ও কীটসকে তো ক্ষমা চেয়ে নিতে দেখেছি শেষ জীবনে। এহসান হাবীবের ' পুষ্পদাহকাল' -এর শালুক ও শালগম পর্ব আমার সে বিশ্বাসকে আরেকটু মজবুত করল। একথা বলছি না যে মাটি ও মানুষের ভেতরে থাকা কবিতার চেয়ে আধ্যাত্ম-সহযোগ কবিতা শিল্পিত হয় সব সময়। তা তো নির্ভর করে কবির সক্ষমতার ওপরই। কবি এহসান হাবীবের সে সক্ষমতা আছে নিশ্চিত ভাবে। প্রথম বাইশ কবিতায় মাটি ও মানুষের , সমাজ ও রাষ্ট্রের রূপরেখা টেনেছেন তিনি, তবে সূক্ষ্মতার প্রাজ্ঞতায় সমাজবিপ্লবের পথ ধরেননি এবার। বরং পীর বংশের ছেলে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন পুঁজিবাদের বাস্তব থেকে, মুক্তির উপায় হিসেবে নিলেন আধ্যাত্মসাধন, মস্তিষ্কে সৃষ্টি করলেন এক পরাবাস্তব ভূমি। এই ভূমির ওপরেই আপাতত তাবু ফেলেছেন কবি এহসান হাবীব। কবি এহসান হাবীবের এই কাব্যিক তাবু অত্যন্ত শক্তিশালী। আগামী মৌসুমে হয়তো বৃষ্টি নামবে পৃথিবীতে, ঝড় হবে, বিপ্লব হবে, সাধুসঙ্গও হবে হয়তো সেই মৌসুমেই, অথবা পরের মৌসুমে। এখন এ পৃথিবীর শুধু দেখার বিষয়— এ সময়ের শক্তিমান কলমের অধিকারী এই কবি তাঁর তাবু নিয়ে কবিতার কোন বন্দরে যেয়ে উঠবেন?
গ্রন্থপরিচিতি :
পুষ্পদাহকাল
ধরণ: কবিতা
কবি : এহসান হাবীব
প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর
প্রকাশনী: উজান
পৃষ্ঠা : ৪৮
মূল্য : ১৭৫ টাকা
প্রকাশকাল: নভেম্বর , ২০২২

কবিতা গ্রন্থপরিচিতি

লেখাটি শেয়ার করুন

Footer Top